বাংলাদেশের চুয়ান্ন বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত খুবই বিরল—যেখানে কোনো রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের আগে সরাসরি জনগণের মতামত আহ্বান করেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। জনগণের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়ার এই প্রয়াস গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও অর্থবহ ও শক্তিশালী করবে—এমনটাই প্রত্যাশা।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন থাকা জরুরি। সে লক্ষ্যেই ইনশাআল্লাহ আমি আমার মতামত সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে উপস্থাপন করার পাশাপাশি বৃহত্তর জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে এই লেখার মাধ্যমে তা জনসম্মুখে তুলে ধরছি।---
কেন জনগণের মতামতভিত্তিক ইশতেহার জরুরি
নির্বাচনী ইশতেহার কোনো রাজনৈতিক দলের কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার ঘোষণা নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা। অতীতে আমরা দেখেছি—ইশতেহারের অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার মুখ দেখেনি। এর অন্যতম কারণ হলো জনগণের বাস্তব চাহিদা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নীতিনির্ধারণের দূরত্ব। জনগণের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করলে সেই দূরত্ব কমবে এবং শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি বাড়বে।
আমার প্রস্তাবনা ও প্রত্যাশা
১. জাতীয় নীতি ও শাসনব্যবস্থা
- জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।
- সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের দায়িত্ব ও কাজের সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
- আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
- দুর্নীতি দমনে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
নতুন সরকারের প্রতি একজন বাংলাদেশির প্রত্যাশা।
২. ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতি
সব ধর্মের মানুষের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইসলামের মৌলিক বিষয়ে অবমাননা রোধে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন এবং অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও অবমাননাকর ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড রোধে সুস্পষ্ট আইন করতে হবে।
ধর্মীয় বিষয়ে অবজ্ঞা ও বিতর্কিত বক্তব্যকে বাক্স্বাধীনতার অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করে সাংবিধানিক স্বীকৃত আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৩. শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার
- শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগীকরণে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
- আলিয়া, কওমি, জেনারেল ও টেকনিক্যাল শিক্ষার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন করতে হবে।
- সকল শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাস সমন্বিত ও স্থানান্তরযোগ্য করতে হবে।
- সব ধর্মের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী ধর্মীয় শিক্ষা সব ধারার সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- রোল নম্বরকেন্দ্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাতিল করে বিজ্ঞানসম্মত ও মেধা ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৪. কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি
- বেকারত্ব নিরসনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
- শিক্ষার্থীদের কেবল বিসিএসকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের করে এনে বহুমুখী ও সম্মানজনক পেশার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
- কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
- বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পার্টটাইম জবের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
- দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
৫. স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি
- প্রতিটি জেলা বা নিকটবর্তী কয়েকটি জেলা সমন্বয়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল (ক্যান্সার, হৃদরোগ, চক্ষু, বক্ষব্যাধি ইত্যাদি) স্থাপন করতে হবে।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।
এই প্রস্তাবনাগুলো কোনো দলীয় আনুগত্য থেকে নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, আত্মমর্যাদাশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা থেকেই প্রণয়ণ করেছি। জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার প্রণয়নের এই উদ্যোগ যদি আন্তরিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
আশা করি সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা এসব মতামত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।

